ভাষা খোঁজে মাতৃভাষা

ভাষাই যেন মানুষের প্রাণ ।প্রতিটি মানুষের তার মূল পরিচয় ভাষার মাধ্যমে।আর জাতীয় পরিচয়ও রচিত হয় ভাষার মাধ্যমে।এই আজব পৃথিবীতে কতো নাম না জানার ভাষা রয়েছে।যার হিসাব সহজে মেলেনা। যার উৎপত্তির স্থলও জানা নেই।কোথায় জন্ম হয়েছে ভাষা?কারাই বা প্রথম ব্যবহারকারী? বা কোন মানব-মানবীরা প্রচলন করে ছিল ভাষা?
কোথা থেকে এলো ভাষা? নাকি কল্পিত স্বর্গ থেকে এসে পৃথিবীর বুকে স্থান করে নিল।নাকি দেবতারা দেবালয় থেকে নিয়ে এসেছিল ধরণীর বুকে।
ভাষা কেন আমাদের এত আপন করে নিল।কেনই বা আমাদের প্রাণ হয়ে উঠলো।যার ইতিহাস এখনো জানা যায়নি।যাকে নিয়ে অনেক ইতিহাস,কবিতা,গল্প বা নাটক রচিত হয়েছিল।
মানুষের প্রাণে সুখ,দুঃখ, আনন্দ, বেদনা,হাসি,কান্না প্রভৃতি ভার জন্মে।আমরা বিভিন্ন উপায়ে সেই ভাবগুলো অন্যের কাছে প্রকাশ করি।উদাহরণস্বরুপ,অবুঝ শিশু যেমন নিজের ভাব কান্নার মাধ্যমে মায়ের করে জানান দেয় অথবা বাকশক্তিহীন মানুষ যেভাবে ইশারা -ইঙ্গিতের মাধ্যমে নিজের ভাব প্রকাশ করে।এভাবে এক একজন মানুষ এক একভাবে নিজের ভাব প্রকাশ করে।
ভাষা সংস্কৃত “ভাষ”* ধাতু থেকে এসেছে,যার অর্থ বলা। তো বলতে পারি ভাষা হলো সেই বস্তু যাকে বলা যায়।আসলেই ভাষা বলতে বোঝায়,যা আমরা শুনি, বলি আর বুঝি।
মানুষের মনে ভাব প্রকাশে জন্য বাগযন্ত্রে সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনিকে আমরা ভাষা বলি। ভাষাকে পণ্ডিতরা নানা ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
মহান দার্শনিক প্লেটো বলেছেন,ভাব আর ভাষার মধ্য পার্থক্য অতি সামান্য। ভাব আত্ম মূক বা ধ্বন্যাত্মক ভাষা এবং তাই যখন ধ্বন্যাত্মক হয়ে আমাদের মুখ দ্বারা প্রকাশ হয় তাকেই ভাষা বলে।
ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি বলেছেন,I will consider a language to be a set(finite or infinite) of sentences,each finite in language an constructed of a finite set o elements.
(আপাতত ভাষাপন্ডিত শহীদুল্লাহ, সুনীতিকুমার উক্তি বাদ)

কোথা থেকে এসেছে আমাদের ভাষা?আমাদের ভাষা কি বীজ থেকে জন্ম হয়েছিল? না, গাছপালার মত যততত্র জন্ম হয়েছিল।নাকি মানুষের মত জন্মে ছিল।এর ইতিহাস জানা বড়ই দুর্ভেদ্য। হাজার বছর আগে আমাদের ভাষা বর্তমানে রুপে ছিল না আর ভবিষ্যতে হাজার বছর পরেও বর্তমান রুপে থাকবেনা। ভাষার রুপ বদলে যায়,আর অর্থের বদল ঘটে।অতীতে হাজার বছর আগেও আমাদের ভাষায় রচিত হয়েছিল গান,কবিতা আর গল্প। হয়তো কালের পরিক্রমায় সেগুলো হারিয়ে গেছে।এখন রচিত কবিতায় গুলো হারিয়ে যাবে সময়ের সাথে সাথে।তবে এগুলো অলিখিত স্মৃতি হয়ে থাকবে শুধু।
চাকমা জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চাকমা।মারমাদের মারমা, বাঙালিদের বাঙাল।
আমি চাকমা বলে আমার মাতৃভাষা চাকমা।আমার ভাষা রুপে, সৌন্দর্য, সুরভী ছন্দে আমি মুগ্ধ হই।ঠিক তেমনি অন্যান্য জনগোষ্ঠীরাও নিজের মাতৃভাষা উচ্ছ্বাসিত। পৃথিবীতে অনেক ভাষা আছে।তবে সেগুলো মাতৃভাষা মত এত রুপ আর শোভা নেই।আমি তার সৌন্দর্যে অন্ধ হয়ে যায়।তার স্পর্শে আমার ঘা আলোকিত হয়।তার হাওয়ায় আমি পাগল হয়ে যায়।তার ছন্দে আমার কণ্ঠস্বর কেপে ওঠে।আমার সুখ বয়ে আছে রৌদ্রতেজের মত উচ্ছ্বাসিত হয়ে। আমার শক্তি তীব্রতা হার মানে আমার মাতৃভাষায় স্পর্শে।এজন্য বলি আমার কাছে মাতৃভাষা মতো আর কোনো ভাষা নেই।চাকমা আমার ভাষা।আমার মায়ের ভাষা।বাবার ভাষা।আমার সমাজের ভাষা।আমার পরিচয়।আমার বার্তা আর আমার অহংকার। আমায় মাতৃভাষা আমার বেদনাকে ভূলুণ্ঠিত করে।আমার ভাষায় ময়ূরপঙ্খি মত নেচে ওঠে আমার হৃদয়।আমার হাসি আর কান্না থরোথরো করে মাতৃভাষায়।আর কোনো ভাষা আমাকে এত আকৃষ্ট করে না।
আমার ভাষা মায়ে মুখের মতো সুভাষী। তার অশ্রুর মতো কোমল।কখনো কখনো অন্য রুপ নিয়ে সে আমাকে আচ্ছাদিত করে। মুগ্ধ করে আমাকে আর প্রকৃতির সৌন্দর্যকে।
মাতৃভাষা মায়ের মতো করে আগলে রাখে কোনো জাতিসত্তাকে। তার পরিচয় বহনে সহায়তা করে। আমাদের অন্যদের সাথে মিশতে সাহায্য করে সেটিই হলো ভাষা অথবা মাতৃভাষা।আসলেই আজ মাতৃভাষার ইতিহাস খুঁজে শরীরে পিপাসা মেটে না।

*ভাষা সংস্কৃত” ভাষ” ধাতু থেকে এসেছে।অর্থাৎ ভাষা মানে বলা(বাংলাএকাডেমি,বাংলাপিডিয়া)