আমি ক্রীতদাস বলছি

আমার ঘামের নির্মিত আপনাদের জমিদারি।
আমার জন্যে আপনার অট্টালিকা ফ্ল্যাট বাড়ি,
আমার ঘামে আপনারা এসি-রুমে বসে থাকো
সারাটা দিন-রাতে।
আমার ঘামে আজ আপনার ল্যান্ড ক্রুজার কিংবা পাজেরো।
আপনার কোর্ট থেকে পারফিউম গন্ধ
সেটা আমার ঘামের জন্যে।

আমার ধর্মগ্রন্থ থেকে আপনাদের ধর্মগ্রন্থ আলাদা।
যেসব মসজিদ, মন্দিরে বসে প্রার্থনা করো
সেখানে আমি মিনার হয়ে,স্তম্ভ হয়ে দাড়িয়ে থাকি।
আপনাদের ইদ,বড়দিন কিংবা বুদ্ধপূর্ণিমা
আমাদের থেকে আলাদা।

যে সংসদে কিংবা পার্লামেন্ট বসে, আপনি মিথ্যা ইশতেহার পেশ করেন
সে সব আমার ঘামে আর রক্তের নির্মিত।

যে সোফায় বসে আপনারা চা-কফি খেতে
আড্ডা মজো,
টেলিভিশন দেখে দেখে আনন্দ উপভোগ করো
সে সব আমার কারুশিল্প।
যে খাটে ঘুমিয়ে আপনারা রাত কাটাও
সেখানেও আমার ঘাম জুরে আছে।

আমার দেহের মাংস খসখসে হয়ে যাচ্ছে,
হাঁড়গুলোর ভার নিতে চাইনা আর
আমার শরীর।
আমারে ঝোটে না গোলাপের সুগন্ধি কিংবা পারফিউমে ব্যাপনীয় সুগন্ধে মেলা।
আমার কপালে ঝোটে শুধু কাজ আর কাজে
মেলা।

আমার সকালটাও শুরু হয়,
জমিদারকে ভাবতে ভাবতে
আমার প্রভু তো আসলেই সে
আমার মস্তিষ্কে সর্বক্ষণ ধরে বিরাজমান
করে, পায়চারি করতে থাকে সারাটা দুপুর ধরে।
আমার মৃত্যুও তার হাতে লেখা।

যার জন্যে কাজ না করলে আমার মুখে ঝটে না
এক মুটোও অন্নের লীলা।
আর আমার পরিবারকে তো বাদই দিলাম।
আমাকে বাঁচার জন্যে কিংবা পরিবারকে বাঁচানোর তাগিদে যার কাছে আমার দেহ বন্ধকী করে রাখি।

যার জন্যে আমার দেহের হাঁড়গুলো ঝরে যায়
সে কিন্তু বোঝেনা আমার দুঃখ-বেদনার ভারাক্রান্ত শরীরের কষ্টকে।
আমার বিষাদ,হতাশা,
গ্রামে ও নগরে নিবর প্রতিধ্বনি হয়।
আমি যুদ্ধ করি হাজার বছরে ধরে
শুধু বাঁচার তাগিদে।

এত কাজ করি, তবু জমিদার ক্ষান্ত হই না।
সে চাই কাজ আর কাজ।
আমি হতাশায় বাকরুদ্ধ হই,কণ্ঠরোধ হয়ে আছে,
কান্নাভেজা চোখে দেখে মেলে হীনমন্যতার চাপ।
বুকেপিঠে আর্তনাদ হয় আমার দেহে সবঅঙ্গ জুড়ে।
মুখোশধারী ধনতন্ত্র আমার মত ত্রুীতদাসকে
করেছে উজাড়।

আমার নখগুলো ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে
জমিতে হাল চাষ করতে করতে
আর ইট-ভাটায়,গার্মেন্টস সেলাই মেশিনে
তোপে পড়ে।

আমার জন্যে আজ সমৃদ্ধ বিশ্ব সভ্যতা।
হাজার বছর আগে পোড়া ইটের তৈরি ইমারত,বিশাল গোয়ালঘর, নালা নর্দমা সব আমারি সৃষ্টি।
হাজার বছর আগেও আমার ঘামের জন্যে
নীলনদে পাড়ে দেখা মেলে পিরামিডে মেলা,
সেই মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা আমার কারিগরি শিল্পে সমৃদ্ধ হয়ে আছে এখনো।
সিন্ধু উপত্যকা জুড়ে হরপ্পা- মোহেন্ঞ্চোদাড়ো নিয়ে যারা আজ ইতিহাস লিখে
সেই সব আমার কারিগরি কাজ।
সেই বিখ্যাত গ্রেট-ওয়াল আমার ঘামে নির্মিত।
যে আগ্রা তাজমহলকে তোমরা ভালবাসার প্রতীক মনে করো,সে সব তো আমার রক্তে আর ঘাম দিয়ে প্রতিষ্ঠিত।
তবুও আমার নাম ইতিহাসের পাতায় স্থান পাই না।

আজও আমার ঘামের গন্ধ জুড়ে আসে
নিউইয়র্কের দেবালয়,লন্ডনের গ্রিনিচ পল্লী,বার্লিন,রোম থেকে
টোকিও পর্যন্ত সুন্দর স্থাপত্য।

ফেরারি জীবনের আমার কঠিনতম দিনগুলো থেকে সীমাহীন শোষণে জোয়াল থেকে আমি মুক্তি চাই।
মুক্তি চাই আমার দেহ,
আমি ক্রীতদাসের জীবনে শেষ চাই।

১/৮/২১,রোনাল্ড চাকমা

তোমাকে খুঁজি

তোমাকে খুঁজি সারাক্ষণ;কারণে-অকারণে

বেলা-অবেলা আর কালবেলায়

বিভোর হয়ে খুঁজতে থাকি

লজ্জিত চোখে!

তবুও পাইনা দেখা।

কোথায় গিয়ে যেন থাকো

আমাকে ছেড়ে বহুদূরে।

সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার বেয়েও

তোমারে নাগালে পাই না।

একি! খেলা করো তুমি

এত লুকোচুরি তোমার

আমাকে নিয়ে।

কিভাবো নিজেকে,নাকি ক্লিওপেট্রা!

সেটা তো আরো ভালো।

তোমাকে মনে পড়ে

এই নির্লিপ্ত হৃদয়ে

আমি হতে চাই

তোমার ক্লিওপেট্রা রাণীর প্রাণপুরুষ।

৩০/৭/২১,MP

পাহাড়ের ডাক

পাহাড় কান্নাভেজা কণ্ঠে
আমাদের ডাকে ;
শত্রুর শিবির থেকে
আমাকে মুক্ত করো
তোমাদের মাতৃভূমিকে মুক্ত করো।

ভীরুদের কাছ থেকে
আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাও,
ওরা আমাকে নিপীড়িত করে রেখেছে
অবাঞ্ছিত করেছে অকারণে।

হায়েনা দল সবকিছু দখল করে নিয়েছে জবরদস্তি করে
নিপীড়িত করে রেখেছে
আমার আত্মীয়দের।

তোমার একটু মিষ্টি হাসি আমাকে

হিমবসনা ধরিত্রীর দিগন্তপ্রসারী

আঁকাবাঁকা পাহাড়ে নিবিড় অরণ্যরেখায়

নিয়ে গেছে

ওগো প্রিয়তা,

তোমার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে

আমি শ্বেতবর্ণ পাহাড় অতিক্রম করি

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র :মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ কবি

রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র

বাংলা সাহিত্যে ভারতচন্দ্র এক অনন্য প্রতিভার নাম।মধ্যযুগের একবারে প্রায় শেষভাগে জন্মগ্রহণ করেন ভারতচন্দ্র। তখনকার সময়ে সমাজে নানা অশান্তি ও অস্থিরতা বজায় ছিল গ্রামে গ্রামে।দেশের শাসনব্যবস্থার নানা বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল তখন।কাল আর সময় দিনেদিনে নষ্ট হচ্ছিল,কবিরাও হারিয়ে যাচ্ছিল কাল আর সময়ে কাছে।তখনকার সময়ে পতন হচ্ছিল বাংলা সাহিত্য। সেই সময়ে অনন্য প্রতিভা মিশ্রণে যেন জন্ম নেন ভারতচন্দ্র।

ভারতচন্দ্রের জন্ম আঠারোশতকে একেবারে প্রথমদিকে,আনুমানিক ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে।তিনি পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান(বর্তমানে হাওড়া জেলা)পেঁড়োবসন্তপুর বা পান্ডুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তার পিতার নাম নরেন্দ্রনারায়ণ রায়।তার জন্মের পরে তাদের পরিবারে নেমে আসে অন্ধকার। সেই সময়ে পান্ডুয়া জেলা বর্ধমান রাজা দ্বারা আক্রান্ত হয়।বর্ধমানেরা রাজা ভুরসুটে জয় করে দখল করে নেন।পান্ডুয়া গ্রাম ছিল ভুরসুটে জেলার অন্তর্ভুক্ত। সেজন্যে বর্ধমানে রাজার অধীনে চলে যায় পান্ডুয়া গ্রাম।ভারতচন্দ্রের পিতাও হারিয়ে ফেলেন জমিজমা  আর ধনসম্পদ। দুর্দিনে চলে যায় তাদের পরিবার।

পরিবারের দুর্দিনে কষ্টে বেড়ে ওঠে ভারতচন্দ্র। তার বয়স যখন দশ সে তখন  মামার বাড়িতে পালিয়ে যায়।নওয়াপাড়া গ্রামে ভারতচন্দ্রে মামার বাস করিত। সেখানে তার পড়াশোনা প্রতি মনযোগ পড়ে।এক পণ্ডিতের কল্যাণে সে সংস্কৃত ব্যাকরণ অধ্যয়ন করে ফেলেন।তখন সে সংস্কৃত সাহিত্যে প্রেমে পড়ে যান।

ভারতচন্দ্র মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিয়ে করে ফেলেন।বিয়ে করে আবার দুর্দিনে পড়ে যান। মামার বাড়ি ত্যাগ করে নিজ বাড়িতে চলে আসেন কবি ভারতচন্দ্র। বাড়িতে পা রাখতে না রাখতে অভিনন্দনের বদলে তিরস্কারে ভাগীদার হন কবি ভারতচন্দ্র। সেই সময়ে রাজভাষা ছিল ফারসি, আর কবি অধ্যয়ন করেন সেই সময়ে অত্যন্ত নিম্ন সংস্কৃত ভাষা।তখনকার সময়ে সমাজে, দেশে রাজভাষা ফারসি বাদে অন্যান্য ভাষার অতটা কদর ছিল না।কেননা কবি  ফারসি ভাষা শিখলে হয়তো সে ভাল চাকুরি করতে পারতো এটাই মনে করতো তার পরিবারে অন্যান্য সদস্যরা।নিত্যদিনের বাড়ির লোকজনে জ্বালা সহ্য হয়নি কবির।ক্ষোভে বসে মনস্থির করেন ফারিস ভাষা শিখবেন বলে।

আবার বাড়িতে থেকে পালান কবি।হুগলি জেলার দেবানন্দপুরে রামচন্দ্র মুনশির বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন।আর সেখানে শিখতে থাকেন ফারসি ভাষা।অল্পদিনে সেই ফারসি ভাষার পারদর্শী হয়ে ওঠেন।আর রামচন্দ্রের বাড়িতে প্রথম কবিতা রচনা করেন।

তখনকার সময়ে রাজভাষা ফারসি ভাষা পারদর্শী হয়ে ১৭২৮ খ্রিস্টাব্দে বাড়িতে ফিরে যান কবি ভারতচন্দ্র। বাড়িতে ফিরে পারিবারিক সম্পত্তির দেখাশুনা ভার অর্পিত তার ওপর।এজন্যে বর্ধমানে যান কবি।এখানে এসে এক অঘটন ঘটে কবির জীবনে।কি এক কারণে কবি গ্রেফতার করে বর্ধমানের রাজা।ঠিকানা হয় জেলাখানায় বন্দী শিবিরে,একসময় কারাগার থেকেও পালান কবি।রাজা যাতে ধরতে না পারে সেজন্যে সে বর্ধমান ছেড়ে ওড়িষ্যা পালিয়ে যান।আর ওড়িষ্যার সন্ন্যাসী হয়ে অল্প কিছুকাল
জীবন অতিবাহিত করেন।সন্ন্যাসীদের সাথে বৃন্দাবনে যাওয়াী সময় হুগলি কৃষ্ণনগর গ্রামে পৌঁছলে তার কিছু আত্মীয় সাথে দেখা হয়।কবিকে ছাড়তে হয় সন্ন্যাসীর জীবন,আর নতুন করে ফিরে আসেন সাধারণ মানুষের ভিড়ে।

একসময় ফরাশডাঙ্গা নামক গ্রামে ফরাসি সরকারের এক জনৈক কর্মচারীর সাথে কবির সাক্ষাৎ ঘটে।সেই কর্মচারীর মান ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী। ভারতচন্দ্র ছিল অসাধারণ কবি।ছন্দ সৃষ্টি করে অনায়াসে।এটা চোখে পরে ইন্দ্রনারায়ণের।সে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে ভারতচন্দ্র পাঠায়।কবি ছন্দ মুগ্ধ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। কবি গুণে মুগ্ধ হয়ে রাজা রাজসভা কবি হিসেবে নিযুক্ত করলেন ভারতচন্দ্রকে।এভাবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে।রাজা কাছ থেকে মাসিক বেতন হিসেবে ৪০ টাকা লাভ করলেন আর বেশ কিছু জমিজমা উপহার পান।

ছোট থেকেই হাস্যরচিক ছিলেন কবি ভারতচন্দ্র। 

দেবাবো বারিজে দুরিলে বানা

তরে মনত উদে মর

ঝিলিক ঝিলিক গুরি দেবা গুজুরিলে

সেক্কে বেজ তরে মনত পরে মর

গুরুঙ গারাঙ দেবা পিরাক

পুরিলে তরে হায় তোগায়

মর মনানে

বর্ষার দিনে কি যেন

ব্যাকুল হয়ে ওঠে মন।

একলা যেন থাকতে চাইনা

শুধু খোঁজে নতুনত্ব।