চুক্তি নাকি প্রতারণা!

চুক্তি নাকি প্রতারণা!

আজ ২রা ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি দিবস। যা জুম্ম জনগণের কাছে এক ঐতিহাসিক দিন।শুধু জুম্ম জনগণের কাছে ঐতিহাসিক দিন বললে ভুল হবে, প্রকৃত পক্ষে এই দিনটি সারা বাংলাদেশের জনগণের কাছে এক ঐতিহাসিক দিন আর মাইলফলক। দীর্ঘ দু দশক সশস্ত্র জীবন কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আছে হাজার হাজার জুম্ম যোদ্ধা।তাদের স্বপ ছিল আকাশ ভরা তারা আর সূর্যের উজ্জ্বল রশ্মির মতো বাকি জীবন অতিবাহিত করার।যারা একসময় পরিবার,পরিজন,আত্মী-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিল নির্জন পাহাড়ে সশস্ত্র লড়াইয়ে জীবনে ।যারা নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভেবে সমাজ,জাতির অধিকার আদায়ে পক্ষে লড়াই করে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল। যারা ত্যাগ করেছিল প্রেম,ভালবাসা আর বন্ধনের আবদ্ধ থাকা এইসব মোহকে।যারা একসময় যুদ্ধ আর সংঘর্ষকে ভালবেসে ছিল তাদেরও জেগেছিল শান্তির পায়তারা। ধ্বনিত হয়েছিল যুদ্ধ নয়,শান্তি চাই।
আজ থেকে ২৩ বছর আগে বাংলাদেশ সরকার(তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ) আর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।যাকে পার্বত্যচুক্তি নামে আখ্যায়িত করা হয়।চুক্তিতে মোট ৭২ধারা লিপিবদ্ধ করা হয়।পার্বত্য চুক্তির দীর্ঘ ২৩ বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও মৌলিক বিষয়গুলো এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে।যা ফল এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিফলিত হচ্ছে। চুক্তি অবাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্যবাসীর জীবনযাত্রা মানে প্রভাব পড়ছে। এখনও পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্জিত হয়নি রাজনৈতিক আর শান্তিপূর্ণ সমাধান।দিনদিন বাড়ছে সংঘর্ষ আর সংঘাত।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন বিষয় ও কার্যাবলী কার্যকরণ এবং পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা,পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করণ,আভ্যন্তরীণ জুম্ম উদ্বাস্তু ও প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের জায়গা-জমি প্রত্যপর্ণ ও তাদের নিজস্ব জমিতে পুনর্বাসন, সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার, অস্থানীয়দের নিকট প্রদত্ত ভূমি ইজারা বাতিল করা,পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল চাকুরীতে জুম্মদের অগ্রাধিকার দেয়া, সেটেলার বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সম্মানজনক ভাবে পুনর্বাসন ইত্যাদি বিষয়গুলো বাস্ততবায়নে সরকার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।বরং বাস্ততবায়ন করা নাম করে অবাস্তবায়িত রাখা ইত্যাদির অজুহাত পার্বত্য চট্টগ্রাম বসাবাসরত জুম্মদের উদ্বিগ্ন তুলছে।
চুক্তি মৌলিক বিষয়গুলো অবাস্তবায়িত হওয়ার কারণে সমন্বয় ঘটেনি আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের শাসনব্যবস্থায়।বর্তমানে দলীয় প্রভাবের ভাটা পড়েছে জেলা পরিষদ কার্যালয়ে।যার কারণে বিভিন্ন চাকুরীর জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে দলীয় প্রভাব।দুর্নীতির কারণে নিয়োগ পাচ্ছে অদক্ষ জনগোষ্ঠী।প্রতিক্ষণে ঝরে পড়ছে মেধাবীরা শিক্ষার্থীরা। চরম দুর্নীতি, অনিয়ম আর দলীয়করণের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থাকে চরম সংকটে দিকে ধাবিত করছে।বেকারত্বের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিটি পদক্ষেপে। ইউএনডিপির প্রাথমিক স্কুলকেও জাতীয়করণ করার উদ্যোগ করতে হবে সরকারকে।যাতে জুম্ম জনগোষ্ঠী শিক্ষায় আলোয় এগিয়ে যেতে পারে।নিয়োগ করতে হবে দক্ষ,মেধাবী শিক্ষার্থীদের।
আজ পর্যটনের নাম করে অবৈধ ভূমি দখলও চলমান।নিজস্ব ভূমির অধিকার পর্যন্ত হারাচ্ছে জুম্ম জনগোষ্ঠী।এখন জুম্মজনগণ অনিরাপদ ও অনিশ্চিত জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য হচ্ছে। যা ভাবিয়ে তুলছে পুরো পার্বত্য অঞ্চলকে।অবৈধ ভাবে প্রতিদিন পার্বত্য বন ভূমি উজাড় হচ্ছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে ভাঙ্গন, ভূমিধ্বস হচ্ছে।সংশয়ে রয়েছে হাজার হাজর জুম্ম জনগোষ্ঠীর প্রাণ।জুম্মদের প্রথাগত ভূমি দখল করে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।
ভূমি বিরোধ ভাবিয়ে তুলছে জুম্মজনগণকে।অবৈধভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে সেটেল বাঙালিদের। যার পরিপ্রেক্ষিতে ভূমি দখল চলছে পার্বত্য অঞ্চলে।জুম্মজনগণের জীবনযাত্রা দারুন প্রভাব ফেলছে ভূমি দখল।নিজেদের ভূমি অধিকার হারাচ্ছে সেটেলদের কাছে।এই ভূমি দখল মানসিকতা সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে সরকারকে।ভূমি বিরোধ আইন নিশ্চিত না করা পর্যন্ত পার্বত্য এলাকায় শান্তি ফিরবে না।তাই পাহাড়িদের ভূমি অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে।
পার্বত্য চুক্তি বাস্ততবায়ন প্রক্রিয়াকে দ্রুত এগিয়ে নিতে সরকারকে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।না হলে শান্তি ফিরবে না পার্বত্য অঞ্চলে।বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার প্রচার করে আসছে, পার্বত্য চুক্তির মোট ৭২ টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত করেছে এবং অবশিষ্ট ধারাগুলোর মধ্যে ১৫টি ধারা আংশিক বাস্ততবায়িত হয়েছে আর বাকি ৯টি বাস্ততবায়নে প্রতিক্রিয়াধীন রয়েছে।বস্তুত চুক্তির ব্যাপারে সরকারের এই বক্তব্য সত্য নয়।জনসংহতি সমিতি বক্তব্য অনুযায়ী চুক্তি মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে আর অবাস্তবায়িত রয়েছে ৩৪ টি এবং আংশিক বাস্তবায়িত ৯টি।তাহলে দেখা যাচ্ছে চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনো অবাস্তবায়িত রয়েছে।
চুক্তি নামে পায়তারা সরকারের বন্ধ করা প্রয়োজন। তা না হলে পার্বত্য এলাকায় শান্তি ফিরে আসবে না।পায়তারার অনায়াসে এলাকায় উন্নয়ন,আইন-শৃঙ্খলা অবনিত ঘটবে।তাই চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s