মানসী আজ উধাও

পর্ব-১ : মানসী আজ উধাও

অবশেষে ঢাকায় আসা হলো মানসীর।সে ঢাকায় একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি হলেন।আজ তার প্রথমবার ঢাকায় আসা।দিনটি ছিল শুক্রবার।সাথে এসেছিলেন তার বাবাও।ফার্মগেটে এক আত্মীয় বাসায়(মামার বাড়ি) শুরু হলো এক নতুন জীবন।হঠাৎ ঢাকায় এসে তার মন বেশ অস্থির হয়ে উঠল।নতুন পরিবেশকে মানিয়ে নিতে তার একটু কষ্ট হলো।শুরু হলো ঢাকা শহরে তার পথচলা।শহরটা তার বেশ অচেনা-অজানা।সঙ্গীরাও তার প্রায় অপরিচিত। শহরটা ঘুরে দেখলেন।বড়-বড় ফ্ল্যাট দেখে তার বেশ ভাল লাগল।মনে মনে ভাবলেন ভবিষ্যতে সেও ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট কিনে নেবেন। কয়েকদিন থাকার পর তার বাবা নিজ বাড়িতে চলে আসলেন।বাবা চলে আসায় তার মন একটু চঞ্চল হয়ে উঠল।তার মনও বাড়িতে আসতে চাইল।তবুও নিয়তি নিয়মে ঢাকায় থাকতে হলো।
ওদিকে ভার্সিটিও ক্লাসের তারিখ ঘোষণা করল।এভাবে কয়েকদিন চলে গেল।
কয়েকদিন পর ক্লাসে নিয়ে যাওয়ার জন্য মামার সাথে নীলক্ষেত গেলেন। বই,কলম,খাতা কিনে বাড়িতে চলে আসলেন।নীলক্ষেত যাওয়ার সময় দেখতে ফেলেন কয়েকজন জুম্ম শিক্ষার্থীকে।সে তো অবাক!তাদের দেখে তার মনে একটু স্বস্তি হল।ভাবলেন কয়েকজন জুম্মদের মত তিনিও একজন ঢাকায় পড়ুয়া। জুম্মদের ঢাকায় লেখাপড়া মানে একটু কদর।জুম্মরাও তাদের একটু আলাদাচোখে দেখে।অন্যদের মতো তিনিও এটা ভাবলেন।
মাঝে মাঝে তার মনে উকি মারে পাহাড়ের দিনগুলি।সে এভাবে সময় কাটায় সেই মধুরদিনগুলি ভাবতে ভাবতে।কত আনন্দের ছিল,কত খুনসুটি ছিল সেইদিনগুলি।

ভার্সিটির প্রথম ক্লাসের দিনটিও এসে গেল।সে ভার্সিটি গেলেন তার মামাকে সাথে করে।সে ঢুকে গেল ক্যাম্পাসের ভেতর।আর তার মামা বাইরে দোকানে উঠে পড়লেন। মানসী জন্য অপেক্ষায় থাকলেন। নতুন ক্লাস শুরু হল ১০টা বেজে।নতুন দিন ক্লাসে সবাই অপরিচিত।মানসী দেখলেন ক্লাসে হাতে গোনা কয়েক জন বাদে প্রায় সবাই বাঙালী। মানসী কয়েকজন জুম্ম শিক্ষার্থীর সাথে পরিচয় হলেন।আর কয়েক জন বাঙালি শিক্ষার্থীর সাথেও।কয়েকদিন চলে গেল।একে একে প্রায় সবাই পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন।
মানসী ভার্সিটি ভর্তি হয়েছেন ম্যানেজমেন্ট বিভাগে।সে নিজ ডিপার্টমেন্ট জুম্ম শিক্ষার্থী ঝিনু চাকমা,কণিকা ত্রিপুরা, রিনা মারমা আর অর্কিড চাকমা সাথে পরিচিত হলেন।তাদের সাথে চলে তার কিছু পথচলা।গল্পে,আড্ডায় মেতে উঠল তাদের ক্যাম্পাস জীবন।এভাবে কিছু দিন চলে গেল।মানসী এবার গুটি কয়েক জন বাঙালি ক্লাসমেটের সাথে পরিচিতি হতে লাগলেন।তাদের মধ্যে রহিম,জান্নাতুল, ফেরদৌসি আর মৌসুমী নাম বেশি মানসীর কাছে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠল।কয়েকদিনে বাঙালি বন্ধুদের কাছে সহজসরল মানসী হয়ে উঠলেন অধিক প্রিয় আপনজন।এভাবে চলে যায় দিনের পর দিন।আস্তে আস্তে মানসী ভুলে যেতে লাগলেন নিজ জুম্ম শিক্ষার্থী ভাই-বোনদের।বেশি বেশি মিশতে লাগলেন বাঙালিদের সাথে।মাসের পর মাসে এভাবে চলে যায়।মানসীর মনও বদলে যেতে থাকে।আস্তে আস্তে ভুলে যায় সে নিজের সংস্কৃতিকে।
বাঙালি শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ক্যাম্পাসে স্মার্ট, স্টাইল, সুন্দর করে সেজে আসত।তাদের দেখে মানসীও স্মার্ট হয়ে ওঠে।স্মার্ট হয়ে ওঠার পর সে জুম্মদের আর কেয়ার/পাত্তা করে না।জুম্মরা মানসীকে অতটা খেয়াল রাখে না।মানসীও চলে যায়।সে এখন বাঙালিদের সাথে মেলামেশা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।স্মার্ট হয়ে ওঠার পর মানসীর খরচ বাড়তে লাগল।মানসী চিন্তায় পড়ে গেলেন।স্মার্ট বা আধুনিক হয়ে উঠতে গেলে তার প্রচুর টাকার দরকার।মানসী পরিবারও এত স্বচ্ছ ছিল না।

মানসীর বাড়ি খাগড়াছড়িতে।তার বাবা প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা করেন আর তার মা টুকটাক সেলাই কাজ করেন।মানসী পরিবারে বড় সন্তান। মানসীরা তিন ভাইবোন।বড় মেয়ে হওয়ার কারণে তাকে সবাই বেশি আদর,ভালবাসত।তার বাবা মারও স্বপ্ন মানসী বড় হয়ে চাকরী করে পরিবারে হাল ধরবেন।বাবা-মার লক্ষ্য ছিল মানসী বড় হলে ম্যাজিস্ট্রেট হবেন।মানসীরও স্বপ্ন ছিল ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া।লক্ষ্য পৌছার জন্য মানসী পরীক্ষা ভাল করতে থাকে।প্রাইমারী, হাই স্কুল আর কলেজ জীবন কাটে নিজের শহর খাগড়াছড়িতে।প্রতিটি পরীক্ষায় সেও ভাল রেজাল্ট করতে থাকে।
গ্রামের মানসী নাম সবাই জানত আর চিনতো। কারণ মানসী খেলাধুলা আর লেখাপড়ায় বেশ পারদর্শী ছিলেন । সে শিশুদের সাথে খেলতে বেশি পছন্দ করত।এভাবে সেইদিনগুলি চলে যায়।
নিয়তির বদলে মানসীও ঢাকায় চলে যায়।
ঢাকায় এসে ঠাই হয় মামার বাড়িতে।সেখান থেকে শুরু নতুন পথচলা।

পর্ব -২ মানসী আজ উধাও

ইদানীং সুদীপ্তও মানসীকে খুব একটা ফোন করে না।সুদীপ্তও ঢাকায় একটা পাবলিক ভার্সিটিতে ভর্তি হয়।সুদীপ্তর সাথে মানসীর ৬ বছরে সম্পর্ক ছিল।পরিবারে ছাপে সুদীপ্ত বদলে যায়।সে পড়ালেখা ব্যস্ত হয়ে পড়ে।তার স্বপ্ন, বিসিএস পাস করে এসপি হওয়া।সে পুরোদমে পড়ালেখা করতে থাকে।
এদিকে মানসী সুদীপ্তকে বারবার ফোন করে।এক দুবার রিসিভ করার পর সে আর মানসী কল রিসিভ করে না।মানসী খুব টেনশন করতে থাকে।শুধু ভাবে সুদীপ্ত কেন ফোন রিসিভ করে না।মানসীর কান্না পাই। বারবার ফোন করেও রিসিভ না করার কারণে মানসীর মনও বদলে যায়।মানসীও আস্তে আস্তে ভূলে যায় সুদীপ্তকে।এভাবে বাড়তে থাকে তাদের মাঝে দূরত্ব।
এদিকে ভার্সিটিতেও পুরোদমে শুরু হয়।মানসীও ক্লাস করতে প্রতিদিন ক্যাম্পাস হাজির হয়। অন্য জুম্ম শিক্ষার্থীরাও ক্যাম্পাসে হাজির হয়।
কয়েকদিন চলে গেল।মানসীও বাঙালি বন্ধুদের সাথে মিশতে থাকে।যতদিন চলে যায় মানসী মনও বদলে যায়।বেড়ে যায় বাঙালিদের সাথে সখ্যতা।ক্যাম্পাস প্রতিদিন দেখা মেলে তাদের আড্ডা। আস্তে করে মানসীও বাঙালি সংস্কৃতি লালন করতে থাকে।আর ভালবাসতে থাকে বাঙালী সংস্কৃতিকে।ভুলে যায় নিজে সংস্কৃতিকে।
এভাবে কয়েক মাস যাবার পর শুরু হয় ১ম বর্ষে পরীক্ষা। চলে ২মাস পর্যন্ত। পরীক্ষার কারণে তাদের আড্ডা একটুও কমে যায়।কিন্তু কমেনি তাদের ফোনে যোগাযোগ। প্রতিদিন রহিম না হয় জান্নাতুল না হয় ফেরদৌস কেউ না কেউ মানসীকে ফোন করতে থাকে।
পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। ১মাস বন্ধ দেয়া ভার্সিটিকে।মানসীও অনেকদিন হলো বাড়িতে আসতে না।সে ছুটি বাড়িতে কাটাতে চাই।কিন্তু তার বন্ধুরা তাকে বাড়িতে আসতে দেয় না।বলে তাদের সাথে ছুটি কাটাতে।রহিম মানসীকে এ ব্যাপারে অনেক বার ফোন করে।ওদিকে মানসী বাড়িতে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয় আছে। রহিম মানসী অনেক বোঝাতে থাকে,কিন্তু মানসীর মন বদলাতে পারলেন।রহিম অনেক অনুনয় করলেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না।মানসীর লক্ষ্য বাড়ি যাওয়া।এভাবে ১ম বার পার পেয়ে গেলেন।চলে আসলেন খাগড়াছড়িতে।তখন ২০১৮ সালে নভেম্বর মাসে ২৬ তারিখ।বাড়িতে কয়েকদিন কাটিয়ে দিলেন।কয়েকদিন পর তার মন বেশ চঞ্চল ওয়ে উঠল।মনে উকি মাকে বাঙালি বন্ধুদের সাথে কাটানো দিনগুলি।এগুলো ভাবতে ভাবতে তার মন আরো বেশি অস্থির হয়ে উঠল।সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকায় ফিরে যাবেন।আর তাদের কয়েকদিন পর রেজাল্ট হওয়ার ও কথা ছিল।মানসীকে তার বাবা-মা তাকে আর কয়েকদিন বাড়িতে থাকতে বললেন। তবুও মানসী ঢাকায় যাওয়ার জন্য ব্যাকুল। অবশেষে বাবা-মার অনেক অনুনয়ে আর কয়েকদিন বাড়িতে থেকে গেলেন।আর বন্ধুরাও তাকে ফোনে কল করতে থাকেন।তার মন আরও চঞ্চল হয়ে ওঠে।
রেজাল্ট এর দিন এসে গেল।যথারীতি মানসীও ভাল মার্ক পেয়ে পাস করলেন।অন্য জুম্ম শিক্ষার্থী পাস করলেন।পাসে খরব পেয়ে মানসীর বাবা-মা আনন্দ উল্লাসিত। গ্রামে মানুষরা রেজাল্ট এর খবর জানতে পারলেন।তারা মানসী প্রশংসা করতে লাগলেন।করণ সবাই জানতেন মানসী ছোট কাল থেকে মেধাবী ছিলেন।
ভার্সিটির ছুটিও ফুরিয়ে এল।মানসীও ভর্তির ঢাকাসহ ঢাকা আসলেন।ভার্সিটি ভর্তির তারিখও ঘোষনা করে দিল।ডিসেম্বরে ২০তারিখ মানসী ক্যাম্পাসে এসে হাজির হলেন।সাথে বাঙালী বন্ধুরা আসলেন।যথারীতি ভর্তিও হয়ে গেলেন।ভর্তি হবার পর কিছুক্ষণ আড্ডা দিলেন।অনেকদিন পর সবাই সবার সাথে দেখা।জান্নাতুল বলল, কি খবর? মানসী।
মানসী বলল;এই কোনো মতে ভাল।মানসী পাল্টা প্রশ্ন করলেন তোমার অবস্থা কেমন?।ভাল, বলে দিলেন জান্নাতুলও।আবার রহিম মানসীকে প্রশ্ন করতে লাগলেন।প্রশ্নটা করলেন, পরিবারের সবাই কেমন আছেন?মানসী বলল ভাল।রহিমে প্রশ্ন করার কারণ টা এই রহিম মানসীকে একটু মনে মনে ভালবাসে।কিন্তু বলতে পারে না।
জানুয়ারি মাস চলে আসলো।ক্লাস রুটিন দেয়া হল।সবাই ক্লাসে আসলেন।
রহিম মানসীর প্রতি একটু দূর্বল ছিলেন।কারণ “ভালবাসা”। তাই বারবার মানসী সাথে কথা বলতে থাকেন…..

ছবি; সংগৃহীত

……..চলবে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s